Cart
No products in the cart.

শীতের আগমনী বার্তা যেমন আমাদের মনে আনন্দ দেয়, তেমনি নতুন মা বাবাদের মনে এক অজানা ভয়ও তৈরি করে। এই সময়ে বাচ্চার ঠান্ডা লাগা নিয়ে চিন্তা থাকে। নবজাতকের শরীর এখনও পুরোপুরি পরিণত নয়, তাই তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার বাড়তি যত্ন প্রয়োজন। তার ওপর শীতের শুষ্ক বাতাস বাচ্চার নরম ত্বককে দ্রুত শুষ্ক ও খসখসে করে তুলতে পারে। তাই শীতকালে নবজাতক শিশুর যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে একটু বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
অনেক মা বাবাই শীতের দিনে বাচ্চাকে গোসল করাতে ভয় পান। আবার অনেকেই বুঝতে পারেন না, শীতকালে বাচ্চার ত্বকের যত্নে কোন ক্রিম বা তেল ব্যবহার করা ভালো। সঠিক তথ্যের অভাবে প্রচলিত কিছু নিয়ম মেনে চলতে গিয়ে অনেক সময় বাচ্চার নরম ত্বকে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। আজকের এই গাইডে আমরা জানব কীভাবে শীতে আপনার বাবুকে আরামদায়ক ও নিরাপদে রাখবেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক শীতকালীন শিশু পরিচর্যার কিছু সহজ ও নিরাপদ নিয়ম।
Table of Contents
শীতের দিনগুলোতে বাচ্চার সঠিক পরিচর্যা ঝটপট বুঝে নেওয়ার জন্য নিচে একটি কুইক সামারি চার্ট দেওয়া হলো।
| পরিচর্যার বিষয় | সঠিক ও নিরাপদ গাইডলাইন | যা এড়িয়ে চলবেন |
|---|---|---|
| গোসলের নিয়ম | প্রয়োজন অনুযায়ী সপ্তাহে কয়েকবার কুসুম গরম পানিতে অল্প সময়ের জন্য গোসল করানো যায়। | অতিরিক্ত গরম পানি, দীর্ঘ সময় গোসল এবং শিশুকে একা পানির কাছে রাখা। |
| পোশাক নির্বাচন | আবহাওয়া ও ঘরের তাপমাত্রা অনুযায়ী নরম, আরামদায়ক স্তরযুক্ত পোশাক। | অতিরিক্ত মোটা পোশাক বা ঘুমের সময় ভারী কম্বল দিয়ে অতিরিক্ত ঢেকে রাখা। |
| ত্বকের যত্ন | ত্বক শুষ্ক হলে গোসলের পর সামান্য ভেজা ত্বকে মৃদু, সুগন্ধিবিহীন ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা যায়। | ত্বকে জ্বালা করে এমন পণ্য বা অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত পণ্য। |
| ঘরোয়া অভ্যাস | ঘর আরামদায়ক উষ্ণ ও বাতাস চলাচলের উপযোগী রাখা। | বদ্ধ ঘরে কয়লার আগুন, ধোঁয়া বা ধূপ জ্বালানো এবং শিশুকে অতিরিক্ত গরম করে রাখা। |
| খাবার | নবজাতককে বয়স অনুযায়ী মায়ের বুকের দুধ বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার দিন। | ১ বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু দেওয়া। |
শীতের এই রুক্ষ দিনগুলোতে আপনার বাচ্চার ত্বকের যত্ন ও আরামের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত শীতকালীন পণ্য বেছে নিতে পারেন। তবে যেকোনো বেবি প্রোডাক্ট কেনার আগে তার উপাদান, বয়সের উপযোগিতা ও শিশুর ত্বকে মানাচ্ছে কি না – এসব বিষয় খেয়াল করা জরুরি।
শীতকাল বড়দের জন্য আরামদায়ক হলেও ছোট বাচ্চাদের জন্য এটি কিছুটা চ্যালেঞ্জের সময়। এ সময়ে তাপমাত্রা কমে যায় এবং বাতাসও তুলনামূলক শুষ্ক হয়ে ওঠে। এর প্রভাব শিশুর কোমল ত্বকে পড়তে পারে।
নবজাতকের ত্বক এখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকে। তাই শুষ্ক আবহাওয়া, অতিরিক্ত গরম পানি, ঘন ঘন গোসল বা ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করে এমন পণ্য ব্যবহার করলে ত্বক সহজেই শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যেতে পারে।
শীতের শুষ্ক বাতাসে কিছু শিশুর ত্বকে লালচে ভাব, চুলকানি বা শুষ্কতার সমস্যা বাড়তে পারে। যাদের আগে থেকেই একজিমা বা নাজুক ত্বকের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের অস্বস্তি আরও বেশি দেখা দিতে পারে।
তাই শীতকালে শুধু বাচ্চাকে গরম রাখাই নয়, তার নরম ত্বক যেন অতিরিক্ত শুষ্ক না হয়ে যায় এবং ঘরের পরিবেশ যেন আরামদায়ক থাকে সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
শীতের দিনে নবজাতককে গোসল করানো নিয়ে অনেক পরিবারেই এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। আসলে অতিরিক্ত ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে পানি প্রস্তুত করা, গোসলের সময় কম রাখা এবং গোসলের পর শিশুকে দ্রুত শুকিয়ে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নবজাতককে প্রতিদিন গোসল করানোর প্রয়োজন নেই। সপ্তাহে কয়েকবার অল্প সময়ের জন্য কুসুম গরম পানিতে গোসল করানো যেতে পারে। বাকি সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী মুখ, ঘাড়, বগল, হাত পা এবং ডায়াপার এলাকার মতো অংশ পরিষ্কার করে দেওয়া যায়।
শিশুর ত্বক যদি খুব শুষ্ক হয়ে যায়, তাহলে ঘন ঘন গোসল না করানোই ভালো। কারণ অতিরিক্ত গোসল ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমিয়ে দিতে পারে।
গোসলের পানি কুসুম গরম হওয়া উচিত। খুব গরম বা ঠান্ডা নয়। শিশুর ত্বক বড়দের তুলনায় নাজুক হওয়ায় অতিরিক্ত গরম পানি সহজেই অস্বস্তি বা ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
পানির তাপমাত্রা যাচাই করার জন্য গোসলের পানির থার্মোমিটার ব্যবহার করা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। পানি প্রস্তুত করার পর আগে থেকেই তোয়ালে, জামাকাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে রাখুন, যাতে গোসল শেষে শিশুকে দ্রুত শুকিয়ে কাপড় পরিয়ে দিতে পারেন।
শীতের দিনে গোসল দীর্ঘ সময় ধরে করার প্রয়োজন নেই। অল্প সময়ের মধ্যেই গোসল শেষ করে শিশুকে ভালোভাবে শুকিয়ে নিন।
বাচ্চাকে গোসল করানোর আগে প্রয়োজনীয় সব জিনিস হাতের কাছে রাখুন। ঘর যেন আরামদায়ক উষ্ণ থাকে এবং শিশুকে কখনোই পানির মধ্যে একা রেখে যাবেন না।
গোসলের সময় শিশুর শরীর আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। খুব বেশি ঘষাঘষি বা শক্ত সাবান ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। গোসল শেষে নরম তোয়ালে দিয়ে শিশুর শরীর আলতো করে মুছে ফেলুন।
বিশেষ করে ঘাড়, বগল, কানের পেছনে এবং ত্বকের ভাঁজগুলো ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। এরপর ত্বক শুষ্ক মনে হলে প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে।
শীতের শুষ্ক বাতাসে শিশুর ত্বক সহজেই শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। তাই ত্বক যদি রুক্ষ বা শুষ্ক হয়ে যায়, তখন উপযুক্ত ত্বকের যত্নের পণ্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
গোসলের পর ত্বক পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার আগেই, অর্থাৎ ত্বকে সামান্য ভেজা ভাব থাকা অবস্থায় মৃদু ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করলে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
এজন্য ঠিক “৩ মিনিটের মধ্যে” লাগাতেই হবে এমন কোনো কঠোর নিয়ম নেই। মূল বিষয় হলো গোসলের পর খুব বেশি দেরি না করে প্রয়োজন অনুযায়ী ত্বকের যত্ন নেওয়া।
শিশুর ত্বক শুষ্ক হলে তুলনামূলক ঘন ক্রিম অনেক সময় হালকা লোশনের চেয়ে বেশি আরাম দিতে পারে। আবার সব শিশুর ত্বকের প্রয়োজন এক নয়। তাই ত্বকের অবস্থা ও পণ্যের উপাদান দেখে নির্বাচন করা ভালো।
তেল ব্যবহার করতে চাইলে শিশুর ত্বকে সেটি মানাচ্ছে কি না খেয়াল করুন। কোনো তেল ব্যবহার করার পর লালচে ভাব, জ্বালা, ফুসকুড়ি বা অন্য কোনো অস্বস্তি দেখা দিলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করুন।
শুধু “প্রাকৃতিক” বা “হারবাল” লেখা আছে বলেই কোনো তেল শিশুর জন্য নিশ্চিতভাবে নিরাপদ এমনটা ধরে নেওয়া উচিত নয়।
শিশুর নরম ত্বকের জন্য ত্বকে জ্বালা করতে পারে এমন উপাদান যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা ভালো। বিশেষ করে অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত পণ্য কিছু শিশুর ত্বকে অস্বস্তি বা জ্বালা তৈরি করতে পারে।
তাই শীতের ক্রিম বা লোশন কেনার সময় শুধু “বেবি” লেখা আছে কি না তা দেখবেন না। পণ্যের পুরো উপাদানের তালিকা পড়ুন এবং সম্ভব হলে মৃদু ও সুগন্ধিবিহীন পণ্য বেছে নিন।
মিনারেল অয়েলকে শুধু নাম দেখেই ক্ষতিকর মনে করার প্রয়োজন নেই। এটি ত্বকের ওপর আবরণ তৈরি করে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং অনেক ত্বকের যত্নের পণ্যে এটি ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট পণ্য শিশুর ত্বকে মানাচ্ছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শীতের দিনে বাচ্চাকে পোশাক পরানোর ক্ষেত্রে অনেকেই ভাবেন, যত মোটা কাপড় পরানো যাবে বাচ্চা তত বেশি সুরক্ষিত থাকবে। আসলে অতিরিক্ত গরম করে রাখাও শিশুর জন্য ভালো নয়।
অতিরিক্ত পোশাক, মোটা কম্বল বা অতিরিক্ত গরম পরিবেশে শিশুর শরীর বেশি গরম হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ঘুমের সময় অতিরিক্ত গরম করে রাখা নিরাপদ নয় এবং নিরাপদ ঘুমের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণও নয়।
শিশুর ঘাড় বা বুক অতিরিক্ত গরম লাগছে কি না এবং ঘাম হচ্ছে কি না খেয়াল করুন। শুধু হাত পা ঠান্ডা লাগছে বলে একের পর এক কাপড় পরিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
শীতের দিনে একটি খুব মোটা কাপড়ের বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি হালকা স্তরের পোশাক ব্যবহার করা সুবিধাজনক। এতে আবহাওয়া বা ঘরের তাপমাত্রা অনুযায়ী একটি স্তর খোলা বা যোগ করা যায়।
তবে তিনটি স্তর সব সময় প্রয়োজন হবে এমন নয়। ঘরের তাপমাত্রা, বাইরে আবহাওয়া এবং শিশুর পোশাকের ধরন অনুযায়ী স্তরের সংখ্যা ঠিক করুন। ঘুমের সময় শিশুর মুখ ও মাথা ঢেকে রাখা, ভারী কম্বল বা আলগা বিছানাপত্র দিয়ে অতিরিক্ত ঢেকে রাখা এড়িয়ে চলুন।
শীতের দিনে শুধু বাচ্চার পোশাকের দিকে নজর দিলেই হয় না। ঘরের ভেতরের পরিবেশও শিশুর জন্য আরামদায়ক হওয়া দরকার।
প্রয়োজনে রুম হিটার ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে ঘর অতিরিক্ত গরম করে ফেলা উচিত নয়। হিটার ব্যবহারের সময় সেটি শিশুর খুব কাছে রাখবেন না এবং প্রস্তুতকারকের নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলুন।
হিটার ব্যবহারে ঘরের বাতাস শুষ্ক লাগতে পারে। এতে শিশুর ত্বক ও নাকের অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই ঘরের বাতাস অতিরিক্ত শুষ্ক মনে হলে প্রয়োজন অনুযায়ী হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করলে সেটি নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। অপরিষ্কার হিউমিডিফায়ারে জীবাণু বা ছত্রাক জমে যেতে পারে।
উত্তরবঙ্গে শীতের তীব্রতা যারা দেখেছেন, তারা জানেন সেখানকার শীত শুধু ঠান্ডা নয়, অনেক সময় হাড় কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো। আমার মেয়ের জন্মও উত্তরবঙ্গে, শীতের সময়। হাসপাতাল থেকে বাবুকে বাসায় নিয়ে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই তাকে উষ্ণ রাখার চিন্তা ছিল।
তখন বাচ্চার মামা একটি রুম হিটার নিয়ে এলেন। প্রথম দিকে হিটার চালিয়ে ঘরটা বেশ আরামদায়কই লাগছিল। তাই না বুঝে ঘরের দরজা-জানালা, এমনকি ভেন্টিলেটরও বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
কিন্তু প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা পর নিজের কাছেই ঘরের বাতাস কেমন শুষ্ক ও অস্বস্তিকর লাগতে শুরু করল। তখন মনে হলো, শীতের কারণে বাতাস এমনিতেই শুষ্ক, তার ওপর দীর্ঘ সময় হিটার চলার কারণে ঘরের পরিবেশ আরও শুষ্ক হয়ে গেছে।
তখন আমি ভেন্টিলেটর খুলে দিই, দরজাও সামান্য ফাঁকা রাখি এবং হিটারের তাপ কিছুটা কমিয়ে দিই যাতে ঘরটা আরামদায়ক উষ্ণ থাকে, আবার বাতাস একেবারে বন্ধও না হয়ে যায়। পাশাপাশি একটি পরিষ্কার ভেজা তোয়ালে এনে ঘরের মধ্যে মেলে দিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর পরিবেশটা আগের তুলনায় অনেক আরামদায়ক মনে হয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের কাছে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়েছিল, শিশুকে শীত থেকে বাঁচাতে গিয়ে ঘর অতিরিক্ত গরম বা একেবারে বদ্ধ করে রাখা ঠিক নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুর জন্য আরামদায়ক তাপমাত্রা ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা।
তবে এটি আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। প্রতিটি ঘর, হিটার ও শিশুর পরিস্থিতি এক নয়। তাই শুধু ভেজা তোয়ালে বা হিটার কমিয়ে দেওয়াকেই নির্দিষ্ট নিয়ম হিসেবে অনুসরণ না করে ঘরের তাপমাত্রা ও শিশুর আরাম বা অস্বস্তির দিকে নজর রাখাই ভালো।
শিশুর ঘর একেবারে বদ্ধ করে রাখার প্রয়োজন নেই। আবহাওয়া ও নিরাপত্তা বিবেচনা করে ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন।
ঘর গরম রাখার জন্য কখনোই বদ্ধ ঘরে কয়লার আগুন, কাঠ পোড়ানো বা অন্য কোনো ধোঁয়া তৈরির ব্যবস্থা ব্যবহার করবেন না। এতে কার্বন মনোক্সাইডসহ ক্ষতিকর ধোঁয়া তৈরি হয়ে শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আমাদের দেশে শীত এলেই প্রবীণদের কিছু প্রচলিত নিয়ম মানার জন্য নতুন মা বাবাদের ওপর চাপ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কিছু অভ্যাস শিশুর জন্য অস্বস্তিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
শীতের দিনে শিশুর গায়ে সরিষার তেল মেখে রোদে রাখার অভ্যাস অনেক জায়গায় দেখা যায়। কিন্তু নবজাতকের নাজুক ত্বকে সরিষার তেল সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে এবং কিছু গবেষণায় দেখা গেছে এটি ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা স্তরে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই নবজাতকের ত্বকে নিয়মিত সরিষার তেল ব্যবহার করার আগে সতর্ক থাকা ভালো। তেল ব্যবহার করতে চাইলে শিশুর ত্বকে মানাচ্ছে কি না এবং পণ্যের উপাদান কী এসব বিবেচনা করুন। এছাড়া শিশুকে দীর্ঘ সময় কড়া রোদে রেখে গরম করার চেষ্টা করবেন না।
ঘর গরম রাখার জন্য অনেকে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে কয়লার আগুন বা ধূপ জ্বালিয়ে রাখেন। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
কয়লা পোড়ালে কার্বন মনোক্সাইডসহ ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হতে পারে। বদ্ধ ঘরে এই গ্যাস জমে গেলে শিশু ও বড় সবারই গুরুতর অসুস্থতা হতে পারে। তাই শিশুর ঘরে এ ধরনের আগুন বা ধোঁয়া ব্যবহার করবেন না।
শীতের ভয়ে শিশুকে দীর্ঘদিন গোসল না করানো বা শরীরের প্রয়োজনীয় অংশ পরিষ্কার না করা ঠিক নয়। প্রতিদিন পূর্ণ গোসলের প্রয়োজন না থাকলেও মুখ, ঘাড়, বগল, ত্বকের ভাঁজ ও ডায়াপার এলাকা পরিষ্কার রাখা দরকার।
শিশুর কাপড়ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করুন। ঘাম, দুধ বা ময়লা লেগে থাকা কাপড় দীর্ঘ সময় পরিয়ে রাখবেন না।
শীত থেকে বাঁচানোর জন্য নবজাতক বা এক বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু খাওয়ানোর প্রচলন রয়েছে। কিন্তু ১২ মাসের কম বয়সী শিশুকে মধু দেওয়া উচিত নয়। মধুতে থাকা কিছু জীবাণুর স্পোর থেকে শিশুর বোটুলিজম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
একইভাবে নবজাতকের জন্য গরুর দুধকে মায়ের বুকের দুধের বিকল্প হিসেবে দেওয়া উচিত নয়। শিশুর বয়স অনুযায়ী মায়ের বুকের দুধই প্রধান খাবার, আর প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিকল্প খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।
শীতের দিনে সতর্ক থাকার পরও বাচ্চার সর্দি বা নাক বন্ধ হতে পারে। এ সময় আতঙ্কিত না হয়ে শিশুর শ্বাস প্রশ্বাস, খাওয়ানো এবং সামগ্রিক আচরণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
নাক বন্ধ হলে সাধারণ নরমাল স্যালাইন নাসাল ড্রপ শিশুর নাকের জমে থাকা শ্লেষ্মা নরম করতে সাহায্য করতে পারে। তবে কত ফোঁটা বা কতবার ব্যবহার করবেন, তা শিশুর বয়স ও ব্যবহৃত পণ্যের নির্দেশনা অনুযায়ী হওয়া উচিত।
নাক বন্ধ থাকার কারণে যদি শিশুর বুকের দুধ খেতে সমস্যা হয়, তাহলে খাওয়ানোর আগে নাক পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। কোনো কড়া সুগন্ধিযুক্ত বাম, ভ্যাপর বা অ্যারোমেটিক পণ্য নবজাতকের নাকের কাছে বা ত্বকে নিজের ইচ্ছায় ব্যবহার করবেন না।
শিশু অসুস্থ থাকলেও মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বুকের দুধ শিশুকে তরল ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিতে সাহায্য করে।
শিশু যদি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম খায়, বারবার বমি করে, খুব নিস্তেজ হয়ে যায় বা খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নবজাতককে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক, কাশির সিরাপ বা ঠান্ডার ওষুধ নিজে থেকে দেবেন না।
শিশুর সর্দি কাশি সবসময় গুরুতর নয়। কিন্তু নবজাতক ও ছোট শিশুর ক্ষেত্রে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে নবজাতকের ক্ষেত্রে জ্বরকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে ঘরোয়া চিকিৎসার অপেক্ষা না করে দ্রুত একজন নিবন্ধিত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন বা প্রয়োজন হলে হাসপাতালে নিয়ে যান।
শীতকালীন শিশু যত্ন নিয়ে মা বাবাদের মনে থাকা কিছু প্রচলিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো।
শীতকালে কি নবজাতককে প্রতিদিন তেল মাখানো যাবে?
প্রতিদিন তেল মাখানো নবজাতকের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। কিছু পরিবারে শিশুর মালিশের জন্য তেল ব্যবহার করা হয়, তবে তেল ব্যবহার করলে শিশুর ত্বকে সেটি মানাচ্ছে কি না খেয়াল করা জরুরি। লালচে ভাব, জ্বালা বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করুন। ত্বক শুষ্ক হলে প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে।
শীতের রাতে বাচ্চাকে কয়টা কাপড় পরাব?
এর নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। ঘরের তাপমাত্রা ও শিশুর পোশাকের ধরন অনুযায়ী কয়েকটি হালকা স্তরের পোশাক ব্যবহার করুন। খুব বেশি ভারী কাপড় বা কম্বল দিয়ে শিশুকে ঢেকে রাখবেন না। শিশুর ঘাড় বা বুক অতিরিক্ত গরম লাগছে বা ঘাম হচ্ছে কি না খেয়াল করুন।
বাচ্চার ঠান্ডা লাগলে কি গোসল পুরোপুরি বন্ধ রাখা উচিত?
শুধু হালকা সর্দি বা নাক বন্ধ থাকার কারণে গোসল পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে শিশুর শরীরের অবস্থা, ঘরের তাপমাত্রা এবং শিশুর আরাম বিবেচনা করে অল্প সময়ের জন্য কুসুম গরম পানিতে গোসল করানো যেতে পারে। গোসলের পর শিশুকে দ্রুত শুকিয়ে আরামদায়ক পোশাক পরিয়ে দিন।
মেডিকেল ও সেফটি ডিসক্লেইমার: এই নিবন্ধের তথ্য সাধারণ শীতকালীন শিশু পরিচর্যা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো পেশাদার চিকিৎসকের বিকল্প নয়। নবজাতকের জ্বর, শ্বাসকষ্ট, খেতে না পারা, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা বা অন্য কোনো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া উপাদান বা নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ওষুধ ব্যবহার না করে দ্রুত একজন নিবন্ধিত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
শীতের এই রুক্ষ দিনগুলোতে বাচ্চাকে আরামদায়ক ও নিরাপদে রাখা খুব কঠিন নয়। প্রয়োজন শুধু কিছু বিষয়ে সচেতন থাকা। আবহাওয়া অনুযায়ী আরামদায়ক পোশাক পরান, শিশুকে অতিরিক্ত গরম করে রাখবেন না এবং ঘুমের সময় নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করুন।
গোসলের সময় অতিরিক্ত গরম পানি ও দীর্ঘ সময় গোসল এড়িয়ে চলুন। শিশুর ত্বক শুষ্ক হলে প্রয়োজন অনুযায়ী মৃদু ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করুন। সরিষার তেল, মধু, ধোঁয়া বা অতিরিক্ত গরম করার মতো প্রচলিত অভ্যাসের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।

শাখাওয়াত আহমেদ বাংলাদেশের জনপ্রিয় বেবি কেয়ার ই কমার্স প্ল্যাটফর্ম BD SNAP এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বিগত ৩ বছর ধরে শিশুর নিরাপদ যত্ন এবং পুষ্টি নিয়ে কাজ করছেন। মা বাবাদের কাছে শতভাগ নিরাপদ ও খাঁটি বেবি প্রোডাক্ট পৌঁছে দেওয়াই তাঁর মূল লক্ষ্য।
